নিজস্ব সংবিধান, পাসপোর্ট, রিজার্ভ ব্যাংক ও সোনা-নির্মিত মুদ্রা—সবই আছে ‘বিশ্বের প্রথম সার্বভৌম হিন্দু রাষ্ট্র’ বলে দাবি করা ইউনাইটেড স্টেটস অব কৈলাসা’র। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি কল্পিত রাষ্ট্র। আর এই রাষ্ট্রের পেছনে রয়েছেন ভারতে ধর্ষণ ও শিশু নিপীড়নের অভিযোগে পলাতক হিন্দু সাধু, স্বামী নিত্যানন্দ।
সম্প্রতি বলিভিয়ার কর্তৃপক্ষ কৈলাসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা দেশটির আমাজন অঞ্চলে অবৈধভাবে এক হাজার বছরের জন্য জমি ইজারা নেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। বলিভিয়া সরকার এসব চুক্তি বাতিল করেছে এবং তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন ও চীনের নাগরিকও আছেন।
বলিভিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব কৈলাসা’কে রাষ্ট্র হিসেবে কোনো স্বীকৃতি দেয় না কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কও রাখে না।
কৈলাসার এমন কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসে বলিভিয়ার একটি পত্রিকার অনুসন্ধানে। জানা যায়, কৈলাসার প্রতিনিধিরা আদিবাসী গোষ্ঠী ‘বাউয়া’র সঙ্গে চুক্তি করে দিল্লির তিন গুণ আয়তনের জমি ২৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে পরবর্তীতে চুক্তির খসড়ায় দেখা যায়, সেখানে জমি ইজারার মেয়াদ ১ হাজার বছর এবং আকাশসীমা ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের কথাও উল্লেখ আছে।
বাউয়া নেতা পেদ্রো গুয়াসিকো বলেন, “তাঁদের কথা শুনে আমরা ভুল করেছি। তাঁরা আমাদের বন সুরক্ষার জন্য অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু সবই মিথ্যা ছিল।”
এই ঘটনাটি ফিরে তাকাতে বাধ্য করে ২০১৯ সালের দিকে। সেই সময় ভারতের হিন্দু ধর্মগুরু নিত্যানন্দ ধর্ষণ ও শিশু নিপীড়নের অভিযোগে দেশ ছাড়েন। তিনি দাবি করেন, এসব ছিল হিন্দুবিরোধীদের ষড়যন্ত্র। পরে তিনি দক্ষিণ আমেরিকা বা ক্যারিবীয় অঞ্চলে আত্মগোপন করেন এবং ঘোষণা দেন—তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব কৈলাসা’।
এই কল্পিত রাষ্ট্রের নামে তৈরি হয় একটি ওয়েবসাইট, দেওয়া হয় ‘ই-সিটিজেনশিপ’। এমনকি জাতিসংঘে প্রতিনিধি পাঠিয়ে বক্তৃতাও দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে কৈলাসার সঙ্গে যুক্ত কিছু বিতর্কিত চুক্তি নিয়েও তোলপাড় হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি শহরের মেয়র ‘সিস্টার সিটিস’ চুক্তি বাতিল করেন। প্যারাগুয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন কৈলাসার সঙ্গে চুক্তির জেরে।
এইসব ঘটনার পর, এখন বলিভিয়ার এই জমি দখলের চেষ্টা ‘কৈলাসা’ ও স্বামী নিত্যানন্দের কল্পনার রাজ্যকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বর্তমানে বলিভিয়া সরকার বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছে।
নিত্যানন্দের অনুসারীদের দাবি অনুযায়ী, তিনি পুনর্জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তাঁর অনুসারীরা মনে করেন, নিত্যানন্দের আশীর্বাদ পেলে ধনীরা পরজন্মেও ধনী থাকবেন। তবে এসব দাবি বাস্তবের মাটিতে কতটা দাঁড়ায়, তা নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
Leave a comment