ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে নয়তলা ভবন থেকে লাফিয়ে তিন কিশোরী বোনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে একাধিক রহস্য সামনে আসছে। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তের বাইরে গিয়ে ঘটনাটির পারিবারিক ও অতীত প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, তদন্তে নতুন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তিন কিশোরীর বাবা চেতন কুমারের নাম ২০১৫ সালের একটি আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। প্রায় ১১ বছর আগে চেতনের তৎকালীন লিভ-ইন পার্টনার একটি ফ্ল্যাটের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে সে সময় পুলিশ নিশ্চিত করেছিল। ওই ঘটনাটি শাহিবাবাদ থানার আওতাধীন রাজেন্দ্র নগর এলাকায় ঘটেছিল।
বর্তমান তদন্তে পুলিশ খতিয়ে দেখছে, ২০১৫ সালের ওই ঘটনার সঙ্গে সাম্প্রতিক তিন কিশোরীর মৃত্যুর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না। যদিও ওই পুরোনো ঘটনায় চেতন কুমারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তবু পারিবারিক ইতিহাসের এই দিকটি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চেতন কুমারের পারিবারিক জীবন ছিল জটিল। তার তিনজন স্ত্রী ছিলেন এবং তারা পরস্পর সম্পর্কে বোন। যে তিন কিশোরী মারা গেছে, তাদের একজন এক স্ত্রীর সন্তান এবং অন্য দুইজন আরেক স্ত্রীর সন্তান বলে জানা গেছে। এই পারিবারিক কাঠামো এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, চেতন কুমার পেশায় ব্যবসায়ী হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আর্থিক সংকটে ভুগছিলেন। তার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের দেনার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য তিনি মেয়েদের ব্যবহৃত কিছু জিনিস বিক্রি করেছিলেন—এমন তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, তিন কিশোরী কোরিয়ান ড্রামা দেখতে পছন্দ করত এবং সাধারণত স্মার্টফোনেই সেসব কনটেন্ট দেখত। ঘটনার দিন তারা মায়ের কাছ থেকে মোবাইল ফোন চেয়েছিল বলে জানা গেছে। কিন্তু সেই ফোনে কোরিয়ান ড্রামা দেখা যায়নি। তাদের বাবা মোবাইল কেড়ে নেওয়ার কারণেই কী তারা ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে? নাকি নেপথ্যে অন্যকিছু? এ নিয়ে পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটে ৪ ফেব্রুয়ারি, যখন তিন বোন নিজেদের আবাসনের ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায়। পুলিশ বলছে, এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, এটি কোনো তাৎক্ষণিক আবেগজনিত সিদ্ধান্ত ছিল নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, পারিবারিক টানাপোড়েন বা অন্য কোনো কারণ কাজ করেছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তিন কিশোরীর সঙ্গে তাদের মায়েদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। বরং বাবার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সম্পর্কগত দিকটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
গাজিয়াবাদ পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ঘটনাটিকে একক কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাই না। পারিবারিক পটভূমি, আর্থিক অবস্থা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং কিশোরীদের মানসিক অবস্থাসহ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।”
এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সমাজে গভীর শোক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর বয়সে পারিবারিক অস্থিরতা ও সামাজিক চাপ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় শুধু আইনি তদন্ত নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
Leave a comment