বর্তমানে বাংলাদেশে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক সংকট নেই। তবে যা ঘটছে, তা মূলত অতীতের ধুলোময় পথে হেঁটে ভবিষ্যতের যাত্রার প্রস্তুতি। আমাদের লক্ষ্য—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যদি এই লক্ষ্যে সবাই একমত হই, তাহলে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল সেই পথেরই অংশ—কারণ এবং ফলাফল, দুটোই।
তবুও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, একটি পরাজিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী মরিয়া হয়ে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে অংশীজনদের মধ্যে বাড়ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস। কেউ বলছে, আগে সংস্কার না হলে নির্বাচনেরই দরকার নেই। আবার কেউ বলছে, দ্রুত নির্বাচন হলে সংস্কার আর হবে না। দুই পক্ষই যেন এক কঠিন দোটানায়।
এমন দোটানার মধ্যে আমরা ভুলে যাচ্ছি এক বড় প্রশ্ন: জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক উত্থান যদি না হতো, তাহলে কি সুষ্ঠু নির্বাচন আর রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে কথাই বলা যেত?
সবাই মেনে নেয় যে, দেশ চালাবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। আর সেই নির্বাচন যেন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, তার জন্য দরকার ছিল ফ্যাসিবাদী শাসনে পচে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার করা। এটাও প্রায় সকলেই মানে—আওয়ামী লীগ ছাড়া।
বর্তমান সরকার বা প্রফেসর ইউনূস যেমন বলেননি, নির্বাচন হবে না—তেমনি বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোও সংস্কারের বিরুদ্ধে নয়। শুধু রাজনৈতিক ভাষার বাগাড়ম্বর, সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য এবং আড্ডায় অতিরঞ্জিত আলোচনা একটি ধোঁয়াটে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিককে বিভ্রান্ত করছে।
এই সংকটের একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে—আস্থার ঘাটতি। আমরা এমন এক জাতি, যারা বহুবার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভাঙার কষ্ট পেয়েছে। নেতাদের মধ্যে যুক্তিবাদী মানুষ অনেক, কিন্তু সরল রাজনৈতিক পথ নিতে তারা দ্বিধান্বিত। হয়তো পুরোনো মানসিকতা, হয়তো আত্মবিশ্বাসের অভাব।
সংলাপে বসলেও ফলাফল হয়নি বললেই চলে। ১৯৯৫, ২০০৬, ২০১৪, ২০১৮—সব নির্বাচনের আগে সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি।
তাই যদি সত্যিকারের সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এগোতে চাই, তাহলে দরকার একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক চুক্তি—যা অতীতে হয়নি, কিন্তু এখন করতেই হবে। এটিই হবে নতুন এক দৃষ্টান্ত, যা জনগণ বুঝবে ও বিশ্বাস করবে।
রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে মতামত দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা একতরফা। আর প্রতিটি পক্ষের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির দূরত্ব আজকের বাংলাদেশে চিন্তার বিষয়।
তাই দরকার একটি খোলামেলা, আন্তরিক, বহুপক্ষীয় সংলাপ—যেখানে রাজনৈতিক দল, কমিশন, সুশীল সমাজ সবাই সরাসরি মুখোমুখি বসবে। একসঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি চুক্তিপত্র তৈরি করা সম্ভব হবে তখনই।
সরকার চাইলে সপ্তাহব্যাপী একটি জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করতে পারে, ঠিক যেমনটা হয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা কোনো কোনো দেশে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে। কেউ বলতেই পারেন, এমন সম্মেলন না করলেও চলে। কিন্তু সেটি হবে বড় এক সুযোগ হারানো। তাতে দেশ আবারও বন্দি হয়ে পড়বে একক শাসনের বৃত্তে।
এই জাতীয় সংলাপে বিভিন্ন অধিবেশনে আলোচনা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় নিয়ে। এর ভিত্তি হতে পারে সেই অলিখিত ঘোষণা—জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের প্রতিফলন।
কমিশনগুলোর সুপারিশ, রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তা, এবং জনমতের সমন্বয়ে একটি সামাজিক চুক্তিপত্র তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে স্বাক্ষর করবে সব পক্ষ। সেটিই হবে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ও রাজনৈতিক রূপরেখা।
এমন একটি চুক্তিতে থাকবে সংস্কারের প্রতি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং নির্বাচনের পথ খুলে দেওয়ার সাহসী স্বীকৃতি। এরপর আর অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে বাধা থাকে না।
তবে মনে রাখতে হবে—ফ্যাসিবাদী, অগণতান্ত্রিক বা গণবিরোধী শক্তির এই প্রক্রিয়ায় কোনো বৈধতা থাকতে পারে না।
প্রফেসর ইউনূস যেমন বলেন, ‘নির্বাচনী ট্রেন’ ইতিমধ্যে চলছে। সেটিকে নিরবচ্ছিন্ন ও সঠিক পথে চালাতে হলে দরকার মসৃণ রাজনৈতিক ট্র্যাক। সেই ট্র্যাক তৈরির প্রথম শর্ত—একটি শক্তিশালী জাতীয় সংলাপ।
এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি সম্মিলিত ভবিষ্যতের দায় কাঁধে তুলে নেব, না আরও একটি সুযোগ হারাব?
লেখাঃ খাজা মাঈন উদ্দিন, সাংবাদিক
Leave a comment