পশ্চিম নাইজেরিয়ার কোয়ারা রাজ্যের দুটি গ্রামে সশস্ত্র বন্দুকধারীদের হামলায় অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ঘটনাটিকে চলতি বছরে দেশটিতে সংঘটিত অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। হামলার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী তল্লাশি ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করেছে।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ওরো ও নুকু গ্রামে হামলাটি ঘটে বলে জানা গেছে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১৬২ জনে পৌঁছেছে বলে জানান ওই এলাকার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ওমর বিও। তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ইসলামিক স্টেট–সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী লাকুরাওয়া হামলায় জড়িত থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এখনো কোনো সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি।
কাইয়ামা অঞ্চলের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সাইদু বাবা আহমেদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতির বিবরণ দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা গ্রামবাসীদের জড়ো করে তাদের হাত পেছনে বেঁধে হত্যা করে। এরপর বহু বাড়িঘর ও দোকানপাটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ব্যাপক সম্পদহানির পাশাপাশি বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
তিনি আরও জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বর্তমানে এলাকায় অবস্থান করছেন এবং মরদেহ শনাক্তের কাজ চলছে। অনেক আহত ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিকটবর্তী জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রামের নেতাসহ কয়েকজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, হামলাকারীরা নিজেদের জিহাদি মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিত এবং অতীতে গ্রামগুলোতে ধর্মীয় বক্তৃতা দিয়েছে। তারা গ্রামবাসীদের নাইজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে শরিয়াহ আইন অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছিল। গ্রামবাসীরা এতে অস্বীকৃতি জানালে ধর্মীয় সমাবেশ চলাকালেই হামলা শুরু হয় ।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ১৭০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, দীর্ঘদিন ধরে হুমকি থাকা সত্ত্বেও যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গত পাঁচ মাস ধরে হামলাকারীরা গ্রামবাসীদের হুমকিমূলক চিঠি পাঠাচ্ছিল বলে জানা গেছে। অ্যামনেস্টি এই নিরাপত্তা ব্যর্থতাকে “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে উল্লেখ করেছে।
কোয়ারা রাজ্যের গভর্নর আবদুল রহমান আবদুলরাজাক হামলাটির তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের চাপে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর “হতাশার কাপুরুষোচিত বহিঃপ্রকাশ” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের কথা উল্লেখ করে বলেন, দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোয়ারা রাজ্য নাইজার রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী সম্প্রতি এ অঞ্চলে তথাকথিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর দাবি করেছে।
নাইজেরিয়া বর্তমানে একাধিক নিরাপত্তা সংকটে জর্জরিত। ইসলামিক স্টেট–সংশ্লিষ্ট অন্তত দুটি গোষ্ঠী দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয়। একটি হলো বোকো হারাম থেকে উদ্ভূত ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রদেশ (ISWAP), অন্যটি লাকুরাওয়া, যা ইসলামিক স্টেট সাহেল প্রদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়। নিরাপত্তা সূত্র বলছে, প্রতিবেশী নাইজারে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সীমান্ত এলাকায় এসব গোষ্ঠীর চলাচল বেড়েছে। এদিকে একই দিনে উত্তর-পশ্চিমের কাটসিনা রাজ্যের ফাসকারি এলাকার ডোমা গ্রামে পৃথক এক হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হন। গত সপ্তাহে উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও আলাদা সহিংস ঘটনায় অন্তত ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটে।
সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কোয়ারা রাজ্যের কিছু এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছিল এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে স্কুল বন্ধ ছিল। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা হিসেবে সোমবার থেকে স্কুল পুনরায় চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক হামলা নতুন করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো করেছে।
Leave a comment