যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নতুন শুল্ক ঘোষণার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঝড় তুলেছেন, তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার তাঁর দেশের জন্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়েছেন—একদিকে প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি করছেন, আবার অন্যদিকে পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
গত বুধবার ট্রাম্প ১০% হারে শুল্ক আরোপ করেছেন সকল দেশের ওপর—এর মধ্যে যুক্তরাজ্যও আছে। কিছু নির্দিষ্ট দেশের ক্ষেত্রে (যেমন চীন) শুল্ক হার আরও বেশি। এর পাল্টা জবাবে চীনও নতুন শুল্ক ঘোষণা করেছে। বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে এর জোরালো প্রভাব পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী স্টারমার উইকএন্ডে তাঁর কান্ট্রি হাউজ চেকার্স-এ বসে ফোন কলে সময় কাটাচ্ছেন। তবে এখনো হোয়াইট হাউজ থেকে সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনকল আসেনি। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ও স্টারমারের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাজ্যকে শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে ২০ জনের একটি দল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
তবে শুল্ক ঘোষণার আগে শেষ মুহূর্তে আলোচনাগুলো থেমে যায়। এখন ব্রিটিশ সরকারের ধারণা—”বল এখন তাদের কোর্টে”, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আবার আলোচনা শুরু করতে পারে।
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, চুক্তি হলেও সেটা হবে খুবই মৌলিক, শুধু “নীতি-ভিত্তিক”, কোনো ব্যাপক বাণিজ্য চুক্তি নয়। ভারতের সঙ্গে যেভাবে দীর্ঘমেয়াদে অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনা চলছে, এটা তার চেয়ে অনেক সহজবোধ্য ও সংক্ষিপ্ত হবে।
তবে সরকার পুরোপুরি এই সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করছে না। অর্থাৎ সব ডিম একটি ঝুড়িতে রাখছে না।
বিজনেস সেক্রেটারি জোনাথন রেনল্ডস জানিয়েছেন, তিনি ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছেন, নতুন শুল্কের প্রভাব নিয়ে। যদিও কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকার বলছিল তারা বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত, বাস্তবে শুল্ক ঘোষণার পর তাদের প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো—চার সপ্তাহ ধরে ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞেস করা, তারা চায় কি না সরকারের পক্ষ থেকে পরে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সরকার নিজে থেকে কোনো প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপে আগ্রহী নয়। এমনকি ক্যাবিনেট সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধায় থাকলেও এখন পর্যন্ত জোরালো বিরোধিতা নেই।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা শুল্কে পাল্টা চায়, কিন্তু একজন মন্ত্রী ঠাট্টা করে বলেন—”তারা ট্রেড ওয়ার চায়, কিন্তু দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারবে না।”
এদিকে, শুল্কে সরাসরি পাল্টা না দিলেও সরকার চাইছে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি আনতে। চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস খতিয়ে দেখছেন, জুনে ঘোষিত খরচ পরিকল্পনার কিছু অর্থ আগেই আনতে পারা যায় কি না। এছাড়া দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ Industrial Strategy দ্রুত বাস্তবায়নের চিন্তাও চলছে।
সরকার মনে করছে, বৈশ্বিক এই অনিশ্চয়তার মাঝে বরং নিজের গৃহীত পরিকল্পনাগুলোকেই এগিয়ে নেওয়ার সময়।
স্টারমারের সরকার অনেক দিন ধরেই বলছে, তারা “আরও দ্রুত এবং আরও কঠোরভাবে” কাজ করতে চায়। কিন্তু বিরোধী দলে থাকার সময় থেকে এই পরিকল্পনাগুলো কেন প্রস্তুত ছিল না—তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের র্যাডিকাল সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের তুলনামূলক ধীরগতি—এই ব্যবধান ব্রিটিশ রাজনীতিতে অস্বস্তি তৈরি করছে।
ব্রিটিশ সরকার স্বীকার করছে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা থেকে নিজেদের পুরোপুরি আলাদা রাখা সম্ভব নয়। তবে তারা চেষ্টা করছে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে। প্রাথমিক প্রত্যাশা ছিল যুক্তরাজ্য শুল্ক থেকে রক্ষা পাবে, পরে ধারণা হলো প্রস্তুত থাকতে হবে, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তবতা অনেক কঠিন।
স্টারমার আবার ফোনে ব্যস্ত, কর্মকর্তারা এখনো অপেক্ষা করছেন মার্কিন পক্ষ থেকে কোনো বার্তার। কিন্তু তারা জানেন না, এরপর কী বলা যাবে।
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক-নীতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের সামনে তৈরি হয়েছে এক জটিল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। স্টারমারের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এর মোকাবেলায় একদিকে ধীর, অন্যদিকে ভিন্নভাবে সক্রিয়—যা ব্রিটিশ রাজনীতিতে এক দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
Leave a comment